সমস্যা চিহ্নিত, দরকার সমাধানের সদিচ্ছা

চলতি বছরের সংশোধিত বাজেট এবং মার্চ মাস পর্যন্ত এর বাস্তবায়নের চিত্র থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট যে দুর্বল রাজস্ব সংগ্রহই আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। আর্থিক সামর্থ্য আছে এমন মানুষদের আয়করের আওতায় এনে ব্যাপক কর ফাঁকির সমস্যার সমাধানের ওপর বাজেট বক্তৃতায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বহুল আলোচিত ব্যাংকিং খাতের বিরাজমান দুরবস্থা ও ঋণখেলাপির ক্রমবর্ধমান সমস্যার গভীরতাও স্বীকার করা হয়েছে। আর্থিক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কিছু কিছু সম্ভাব্য পদক্ষেপের কথাও বাজেট বক্তৃতায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অর্থমন্ত্রী নিজেই জানেন যে এসব ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা। যেমন ঋণখেলাপিদের জন্য দেউলিয়া আইন প্রয়োগের কথা তিনি বলেছেন। কিন্তু প্রভাবশালী ঋণখেলাপিদের এ আইনের আওতায় আনা যে সহজ কাজ হবে না, সেটা তাঁর না বোঝার কথা নয়। বাজেট বক্তৃতায় একাধিকবার আমাদের উচ্চ আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। দুর্নীতি, ঋণখেলাপি, করখেলাপির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে না আসতে পারলে যে এ লক্ষ্য অর্জিত হবে না, এটাও হয়তো এখন আমাদের নীতিপ্রণেতাদের উপলব্ধিতে এসেছে। সুশাসনের এসব আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশ অন্য যেসব দেশের সমগোত্রীয় বলে বিবেচিত, সেগুলো সবাই অতিদরিদ্র বা অর্থনৈতিকভাবে স্থবির। এসব সমস্যার সমাধান অনেক আগেই আমাদের খোঁজা দরকার ছিল, কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় সমস্যাগুলোর গভীরতা স্বীকার করে নেওয়াও একটা ইতিবাচক প্রাথমিক পদক্ষেপ। শিক্ষার মান, জনশক্তির প্রশিক্ষণ ও সামাজিক সুরক্ষার ক্ষেত্রে কিছু কিছু পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এর থেকে নীতিপ্রণেতাদের সদিচ্ছার প্রকাশ মেলে। কিন্তু প্রয়োজনের নিরিখে এবং সমকক্ষ অন্য দেশের তুলনায় এসব সামাজিক উন্নয়ন খাতে আমাদের বাজেটের বরাদ্দ যে খুবই অপ্রতুল, তার কারণও রাজস্ব সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা। নতুন ভ্যাট আইন অবশেষে কার্যকর হতে যাচ্ছে। তবে সংশোধিত আইনে বিভিন্ন হারের ভ্যাট কী নীতির ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে, তা স্পষ্ট নয়। উৎপাদন এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রয়ের স্তরভেদে আলাদা হার প্রস্তাব করা হয়ে থাকতে পারে, যা বর্তমানেও প্রচলিত। আবার পণ্যটি বিলাসদ্রব্য বা অত্যাবশ্যকীয়, সে বিবেচনাও থাকতে পারে। সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট প্রয়োগ করা হলে পূর্ববর্তী পর্যায়ের দেওয়া ভ্যাটের সঙ্গে সমন্বয়ের ব্যবস্থাও থাকতে পারে। এত রকমের বিবেচনায় সংশোধিত ভ্যাট কাঠামোয় নতুন করে অনেক অসংগতি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন, ব্যাপক ভ্যাট ফাঁকি কমানো। তা না হলে শুধু কাগজে-কলমে করহার নিয়ে বিশ্লেষণ করার তো কোনো অর্থ হয় না। ব্যবসাবান্ধব বাজেটের কথা এবার আগে থেকেই শোনা যাচ্ছিল এবং ব্যবসায়ী মহলের সঙ্গে দরদস্তুর করেই ভ্যাট আইন সংশোধন করা হয়েছে বলে মনে হয়। করনীতি বাস্তবায়নের জন্য অবশ্যই ব্যবসায়ী মহলের সহযোগিতা প্রয়োজন। তবে করনীতির নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ ও মূল্যায়নেরও কোনো বিকল্প নেই। কর কাঠামোর পুনর্বিন্যাসের ক্ষেত্রে সংগতভাবেই বিনিয়োগ ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরির বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের বিবেচনায় থাকে। তবে কর ফাঁকি রোধ করা বা পণ্য আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে দুর্নীতি-অনিয়ম রোধ করা যে সৎ উদ্যোক্তাদের পরোক্ষ প্রণোদনা দেওয়ার একটা বড় উপায়, তা বিবেচনায় থাকা দরকার। এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে কর সুবিধা বা ভর্তুকি দেওয়া থেকেও ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নয়ন ও প্রণোদনা তৈরিতে এটা বেশি কার্যকর পন্থা। বাজেটে প্রস্তাবিত কিছু পদক্ষেপের পেছনে এ উপলব্ধিও কাজ করেছে বলে মনে হয়। বাজেটের ব‌িশেষ কিছু প্রস্তাব দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো। বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সকে হুন্ডি ব্যবসায় থেকে সরিয়ে নিয়ে ব্যাংকিং খাতে আকৃষ্ট করার জন্য ২ শতাংশ হারে ভর্তুকির প্রস্তাব করা হয়েছে। আমার জানামতে, অর্থমন্ত্রী তাঁর বর্তমান দায়িত্ব গ্রহণের আগেও বেশ কিছুদিন ধরে এ নিয়ে চিন্তাভাবনা করেছিলেন। এখন দেখার বিষয়, এই প্রণোদনা কতখানি ফলপ্রসূ হয়। রপ্তানিতে উৎসাহ দেওয়ার জন্য তৈরি পোশাকসহ অন্য কিছু খাতেও নগদ সহায়তার ব্যাপ্তি বাড়ানো হয়েছে। তবে ভর্তুকি দেওয়ার পরিবর্তে টাকার বিনিময় হার অবমূল্যায়িত হতে দেওয়া বেশি কার্যকর কি না, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন। বিশেষত যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ছেড়ে টাকার অবমূল্যায়ন ঠেকিয়ে রাখতে হচ্ছে। মোবাইল ফোনের সেবা এবং এ-সংক্রান্ত অন্যান্য করের হার বাড়িয়ে দেওয়া কোনো যুক্তিতেই সমর্থনযোগ্য নয়। মোবাইল ফোনের ব্যবহার এখন নিম্নবিত্ত মানুষের দৈনন্দিন কাজকর্মের জন্যও অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। কর সংগ্রহের একটা সোজা উপায় বলেই এ খাতের প্রতি কর কর্তৃপক্ষের বেশি আগ্রহ। কিন্তু কর আরোপের ক্ষেত্রে ন্যায্যতার বিবেচনাও জরুরি। এমনিতেই পরোক্ষ করের একটা বড় অংশ দৃষ্টিকটুভাবে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলো থেকে সংগ্রহ করা হয়। সঞ্চয়পত্রের ওপর উৎসে আয়কর ২০১৬ সালে ৫ শতাংশে কমিয়ে এনে এখন আবার পূর্বের ১০ শতাংশে নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। যেসব মধ্যবিত্ত পরিবার শুধু সঞ্চয়পত্রের মাসিক আয় থেকে পারিবারিক ব্যয় নির্বাহ করে, তাদের জন্য এটা একটা বড় বোঝা। এসব পরিবারের মোট আয় যদি আয়করযোগ্য না হয়, তবে উৎসে আয়কর প্রয়োগ অযৌক্তিকও বটে। সমস্যাটি অন্য জায়গায়। সঞ্চয়পত্রের উচ্চ সুদহারের সুবিধাভোগীদের বড় অংশই উচ্চ বা উচ্চ মধ্যবিত্তের মানুষ এবং এই উচ্চ সুদের হার শুধু যে সরকারের সুদ পরিশোধের দায় বাড়াচ্ছে তা নয়, আর্থিক খাতের জন্যও সমস্যা সৃষ্টি করছে। নিম্নবিত্তের পরিবারের জন্য বর্তমানের উচ্চ সুদের সঞ্চয়পত্র চালু রেখে সাধারণভাবে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো যায় কী করে, সে নিয়ে ইতিমধ্যে চিন্তাভাবনা হচ্ছে। আশা করি, একটা কার্যকর সমাধান মিলবে। আয়করের ওপর সারচার্জ অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষেত্রে সম্পদের সর্বনিম্ন পরিমাণ সোয়া ২ কোটি থেকে ৩ কোটি টাকায় উন্নীত করার যুক্তি বোঝা গেল না। এমনিতেই আয়কর রিটার্নে সম্পদের বিবরণ যথাযথভাবে দিলেও তা প্রকৃত বাজারমূল্যের বিবেচনায় অনেক কম হয়। তার ওপর দেশে সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। এ অবস্থায় উচ্চতর হারের সম্পদ কর কার্যকর করার পরিবর্তে কর অব্যাহতি দেওয়া উল্টো পথে হাঁটার মতো।

লেখক: অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ