শহীদ মিনার নির্মাণ করার ইতিহাস

বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় কলেজ চত্বরে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করতে চেয়েছিল ছাত্ররা। কিন্তু আইয়ুব শাসক গোষ্ঠীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আবদুল জব্বার অনুমতি দিতে পারেননি। তখন ১১ দফা দাবিতে উত্তাল ছিল সারা দেশ। পরে নিষেধ উপেক্ষা করে ১৯৬৯ সালের এক রাতে ছাত্ররা সংঘবদ্ধ হয়ে কলেজে একটি শহীদ মিনার নির্মাণ করে। লক্ষ্মীপুরে এর আগে কোনো শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়নি।

জানা যায়, সাধারণ শিক্ষার্থীদের সহযোগিতায় তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা ও লক্ষ্মীপুর পৌর শহীদ স্মৃতি একাডেমির প্রধান শিক্ষক হোসেন হায়দার ভূঁইয়া, লক্ষ্মীপুর মহিলা কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মনছুরুল হক, টাউন হলের সাধারণ সম্পাদক জগদীশ সাহা পঞ্চু, প্রয়াত সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার আনোয়ারুল হক, প্রয়াত জাসদ নেতা সালাহ উদ্দিন ভূঁইয়া, নিজাম উদ্দিন প্রমুখ এই শহীদ মিনার নির্মাণে এগিয়ে আসেন। কলেজের শতাধিক ছাত্র নির্মাণকাজে তাঁদের সহযোগিতা করে। এতে এক রাতেই গড়ে ওঠে লক্ষ্মীপুরের প্রথম শহীদ মিনার। সে সময় আওয়ামী লীগ নেতা চিকিৎসক আবুল বাশারের বাসা থেকে ইট সংগ্রহ করা হয়। এ সময় প্রায় ২০০ গজ দূর থেকে ছাত্ররা হাতে করে ইট ও অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী বহন করে। কলেজের পূর্ব পাশে মসজিদসংলগ্ন পাঁচ-ছয় ফুটের শহীদ মিনারটি স্থাপনের মধ্য দিয়ে লক্ষ্মীপুরে ইতিহাস সৃষ্টি হয়।

ওই শহীদ মিনার নির্মাণে নেতৃত্বদানকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্মাণের পরদিন আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে নিয়ে ওই শহীদ মিনারে প্রথম পুষ্পমাল্য অর্পণ করা হয়। পরে মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ মিনারটি রাতের আঁধারে রাজাকাররা ভেঙে ফেলে। ১৯৭২ সালে কলেজ গেটে শহীদ মিনারটি স্থায়ীভাবে ফের স্থাপন করা হয়। পরে ১৯৮৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লক্ষ্মীপুর জেলা প্রতিষ্ঠা হয়। এরপর ১৯৮৫ সালে রেহান উদ্দিন ভূঁইয়া সড়কে (জিরো পয়েন্ট এলাকা) তৎকালীন জেলা প্রশাসক এম এম দত্ত ও স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় জেলা পরিষদের অর্থায়নে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার স্থাপন করা হয়।

সর্বশেষ ২০০৬ সালে বড় পরিসরে সার্কিট হাউসের সামনে লক্ষ্মীপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। এর পর থেকে ওই শহীদ মিনারে জেলা প্রশাসন, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এ ছাড়া শহীদ মিনার মাঠে বিভিন্ন সংগঠন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নাটক ও সভা-সেমিনার করে আসছে।

সদ্য অবসরে যাওয়া লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ ও জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন খেলাঘরের জেলা সভাপতি মাইন উদ্দিন পাঠান বলেন, কলেজের শহীদ মিনারটি লক্ষ্মীপুরের একটি ইতিহাস। মিনারটির মর্যাদা রক্ষায় চারপাশে প্রাচীর রয়েছে। বিভিন্ন দিবসে এটিকে সজ্জিত করা হয়। প্রতিবছর লক্ষ্মীপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো হয়।

লক্ষ্মীপুরের প্রথম শহীদ মিনার স্থাপনের অন্যতম উদ্যোক্তা হোসেন হায়দার ভূঁইয়া বলেন, ‘১১ দফা দাবিতে দেশ তখন উত্তাল ছিল। রাতের আঁধারে লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই আমরা শহীদ মিনার নির্মাণ করেছিলাম। পরে যুদ্ধের সময় রাজাকাররা শহীদ মিনারটি ভেঙে দেয়। ১৯৭২ সালে ফের কলেজ গেটে শহীদ মিনারটি নির্মাণ করা হয়।