শহীদ জিএম রুহুল আমিন ভূঁইয়া ছিলেন চাটখিলের বাতিঘর

শহীদ জিএম রুহুল আমিন ভূঁইয়া। মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের ২৫ তারিখ মধ্যরাতে স্বাধীনতাবিরোধী গুপ্ত ঘাতকেদের হাতে নির্মমভাবে শহীদ হন। তাঁর মৃত্যুর ৪৯ বছর পরেও এলাকার মানুষের মনের মনিকোঠায় তিনি চিরঞ্জীব হয়ে আছেন।

মানুষের অন্তরে তাঁর অবস্থান ছিলো মহীরূহের মতো। গরীব, অসহায়, নিরন্ন, অসুস্থজনের তিনি ছিলেন আশ্রয়স্থল। খিলপাড়া, কড়িহাটি, চাটখিল, দশঘরিয়া, সাহাপুর, সোমপাড়া, দত্তপাড়ার গাঁ গেরামীদের কাছে তিনি ছিলেন বিপদের বন্ধু, আকাঙ্খার গন্তব্য। সত্তুরের নির্বাচনে তিনি চষে বেড়িয়েছেন রামগঞ্জ থানার প্রায় প্রতিটি গ্রাম জনপদে। একজন নিবেদিতপ্রাণ আওয়ামীলীগ কর্মী হিসাবে অকাতরে খরচ করেছেন অজস্র টাকা পয়সা। নেতা কর্মীদের বিপদ আপদে তিনিই ছিলেন ভরসাস্থল। তাঁর এই দানপ্রবনতা ও দয়ালু মনোবৃত্তির কারণে মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করতো, ভালবাসতো।

৭ মার্চে তিনি নিজ মালিকানাধীন আমিন এক্সপ্রেস বাস নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের সাথে করে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় যোগ দেন। পরদিন সকালে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। রামগঞ্জের এক নিভৃত পল্লী থেকে বাসে চেপে নেতাকর্মী নিয়ে ঢাকায় এসেছেন শুনে বঙ্গবন্ধু রুহুল আমিন ভূঁইয়াকে পিঠ চাপড়ে ধন্যবাদ জানান এবং সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলে কাজ চালাবার আহবান জানান।
ঢাকা থেকে এলাকায় ফিরে এসে তিনি মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সাধুরখিলের এক্সআর্মী সুবেদার নাজিরকে দিয়ে খিলপাড়া হাইস্কুল মাঠে শুরু করলেন মুক্তিযোদ্ধা তৈরির ট্রেনিং। খিলপাড়ার জালাল কোম্পানি, মল্লিকা দিঘির পাড়ের গাজী মাশীহুর রহমান, নোয়াখলার শামছুল আমিন, এয়াছিন হাজীর হাটের মাওলানা আবদুল বাকি প্রমূখদের সাথে নিয়ে এলাকার যুবসমাজকে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে লাগলেন। ২১ মার্চ রামনারায়ন পুরের এক্স আর্মী আহম্মদ উল্লাহ দিয়ে মল্লিকা দিঘির পাড়ে ট্রেনিং করানো হয়। সেই আয়োজনের নেপথ্যে ছিলেন শহীদ জিএম রুহুল আমিন।
যুদ্ধে আগে আগরতলা মামলার আসামীদের যখন ধরপাকড় করা হচ্ছে তখন তাঁকে গ্রেফতার করার জন্য তার বাড়িতে পুলিশ হানা দিয়েছিল। তখন পুরো খিলপাড়া এলাকায় টেলিফোন সংযোগ ছিলো হাতে গোনা। তাঁর বাড়িতে টেলিফোন ছিলো। কেন্দ্র থেকে যাবতীয় খবরাখবর টেলিফোনের মাধ্যমে জানা যেতো। স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বিশেষত আবদুল মালেক উকিল, আরিফুর রহমান সুধারামী, খাজা আহমদ, আবদুল মোহাইমেন, খালেদ মোহাম্মদ আলী, তোয়াহাসহ সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। জাতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে তাজ উদ্দিন আহমদ, ক্যাপটেন মনসুর আলীর সাথে তার ঘনিষ্ঠতা ছিলো। সেকারণে যুদ্ধের শুরুতেই তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রশিক্ষণ, অস্ত্রের যোগান, রসদের সংস্থান, ট্রানজিট ক্যাম্প নির্মানের দিকে অধিক মনোযোগ দেন। তাঁর সাথে সহযোদ্ধা হিসাবে নুরুল আমিন ভুঁইয়া, আবদুর রাজ্জাক, আবদুল হাকিম কালু, কালু মাস্টার, আতিক উল্লাহ ফরাজী, হাজী আছমত আলী, সায়েদুর রহমান, ছৈয়া পাগলাসহ ছাত্র যুবকদের একটা বড়ো অংশ কাজ করেছিলো (সবার নাম সংগ্রহ করতে পারিনি)।

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রথম পাঁচমাস তিনি দেশমাতৃকার কল্যানে অশেষ অবদান রাখেন। রামগঞ্জের পূর্বাঞ্চলে ১৯৭১ সালের মধ্য আগস্ট পর্যন্ত হানাদার ও রাজাকার বিরোধী যতোগুলো অপারেশন হয়েছে তার প্রায় প্রতিটির সাথে কোনো না কোনো ভাবে শহীদ জিএম রুহুল আমিন সম্পৃক্ত ছিলেন। ওনার ছোটভাই মরহুম গোলাম মোস্তফা ভুঁইয়া, তিন ভাগিনা যথাক্রমে মোহাম্মদ হাসান (পরিবহন ও ত্রাণ আধিকারিক, ত্রিপুরা শরনার্থী ক্যাম্প, মুজিব নগর সরকার), মোহাম্মদ হোসেন (মুক্তিযুদ্ধ সংগঠক, গাইড ও তথ্য সংগ্রাহক) ও মাছুম মোহাম্মদ মহসিন ( উপ কমান্ডার) মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ অংশ নেন। পরিবারের অধিকাংশ সদস্য মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়া ফলে তিনি স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধবাদী চক্রের রোষানলে পড়েন।
দিনভর মুক্তিযুদ্ধের নানাবিধ কাজ যেমন গোয়েন্দা রিপোর্ট , অস্ত্র ও গোলাবারুদ যোগাড়, ভারতে লোক পাঠানে, ট্রেনিং শেষে ফিরে আসা যোদ্ধাদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থায় নিজেকে ব্যস্থ রেখে রাতে যোগ দিতে হতো নেতৃবৃন্দের সাথে গোপন বৈঠকে। সে কারণে স্ত্রী সন্তানদের কাছে নিজগৃহে ফিরতে পারতেন না। রাত্রিবাস করতে হতো নৌকায়। ধামালিয়া বিলের বাজাল ধানের ফাঁকে বা পাট ক্ষেতের আড়ালে ঘুমে নির্ঘুমে রাত কাটতো তাঁর। চাটখিল, সোনাইমুড়ী আর রামগঞ্জের বড়ো বড়ো খাল বিলে লুকিয়ে চুরিয়ে অবস্থান নিয়ে তিনি সহযোগিতা করতেন মুক্তিযোদ্ধাদেরকে। একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী হিসেবে নিজের আয়কৃত সমুদয় অর্থ ব্যয় করেছিলেন যুদ্ধের মাঠে।

হয়তো যুদ্ধের শেষাবধি তিনি আমাদের জন্য তৈরি করতেন নতুন কোনও বীরত্বগাঁথা। কিন্তু ঘাতকের বেয়ানেট তাঁকে বাঁচতে দেয় নি। ১৯৭১ সালের ২৫ আগস্ট মধ্যরাতে চাটখিল খিলপাড়া সড়কের “হরহরিয়া গাছের গোড়া” এলাকায় মুক্তিযুদ্ধের অকুতোভয় যোদ্ধা জিএম রুহুল আমিন ভুঁইয়া নির্মমভাবে শহীদ হন।

আজাদ বুলবুল
১০ আগস্ট ২০২০

(এই রচনাটি শহীদ জিএম রুহুল আমিন এর মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখার পূর্ণ বিবরণ নয়। সংক্ষিপ্ত এবং প্রক্ষিপ্ত আলাপ মাত্র। তাঁর সম্পর্কে আলোকপাত করতে গিয়ে অন্য অনেকের নাম অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়ে গেছে। এই লেখায় যে কোন অনুল্লিখিত তথ্য সংযোজনের দাবী রাখবে।)