লবণের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় চাষীর আহাজারী,

দেশের প্রধান লবণ উৎপাদন কেন্দ্র কক্সবাজারের মাঠে আকস্মিক লবণের দাম এ যাবৎকালের সর্বনিম্নে নেমে এসেছে। গতকাল সোমবার কক্সবাজারের কতুবদিয়া ও মহেশখালী দ্বীপের মাঠ পর্যায়ে প্রতি মণ উৎপাদিত লবণের দাম ছিল মাত্র ১৫০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কেজি লবণের দাম মাত্র ৩ টাকা ৭৫ পয়সা। অথচ প্রতি কেজি লবণ উৎপাদনে চাষীদের খরচ হয় ৬ টাকা ২৫ পয়সা। মাত্র এক সপ্তাহে দাম উদ্বেগজনকভাবে কমে গেছে। গেল সপ্তাহেও ছিল মণপ্রতি ১৮০ টাকা।

লবণের দাম সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসায় কক্সবাজার উপকূলের ৬০ হাজার লবণ চাষীর ঘরে রীতিমতো আহাজারী শুরু হয়েছে। একর প্রতি এক মৌসুমের জন্য ৭৫ হাজার টাকায় বর্গা জমি নিয়ে এবার সেই টাকাও তুলতে পারবে না- চাষীরা এমন আশংকায় রয়েছেন। গেল বছর বাম্পার লবণ উৎপাদন হয়েছিল। এমনকি বিগত ৫০ বছরের উৎপাদন রেকর্ড ভঙ্গ করে ১৮ লাখ ২৪ হাজার মেট্রিক টন লবণ। চাহিদা ছিল ১৮ লাখ মেট্রিক টন। তদুপরি দামও ছিল যথেষ্ট। কিন্তু এবার মৌসুমের মধ্যভাগে এসে লবণের দাম অস্বাভাবিকভাবে পড়ে যাওয়ায় হতাশ চাষীরা মাঠ থেকে উঠে যাচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন গতকাল কালের কণ্ঠকে জানান- ‘উপকূলের লবণ চাষীরা উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে মানববন্ধনসহ নানাভাবে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন। আমি লবণ পরিস্থিতির বিস্তারিত সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেছি। সেই সঙ্গে ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির ব্যাপারে আশ্বস্থ করে চাষীদের যথারীতি উৎপাদনে মনোযোগী হতে পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছি।’

মহেশখালী উপজেলার নলবিলা গ্রামের বাসিন্দা আবদুল হক জানান, বিগত ৪০ বছর ধরে তিনি লবণ চাষের সঙ্গে জড়িত। তিনি জানান, লবণের উৎপাদন এখনো আশানুরূপ হচ্ছে না। এ পর্যন্ত তার জমিতে একর প্রতি লবণ উৎপাদিত হয়েছে ৫০ মণ। অথচ গতবছর এ সময়ে উৎপাদন হয়েছিল একশত মণ। তিনি জানান, ঢাকা এবং চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি শিল্প কারখানায় তিনি প্রতিমাসে লবণ সরবরাহ করতেন। বিভিন্ন শিল্প কারখানায় চাহিদা অনুযায়ী তিনি লবণ জোগান দিতেন। গত ৩/৪ বছর ধরে ওইসব কারখানার মালিক তার কাছ থেকে লবণ কিনছেন না। কারণ তারা আমদানিকারকদের কাছ থেকেই লবণ কিনছেন।

কক্সবাজারের মহেশখালী দ্বীপের আমান উল্লাহ নামের একজন লবণ চাষী জানান- ‘আমরা ১৭ জন চাষী মিলে যৌথভাবে ১০০ কানি (৪০ একর) জমিতে লবণ চাষ করছি। একর প্রতি খরচের হিসাব হচ্ছে, একজন মজুর ৬ মাসের জন্য ৬০ হাজার টাকা, জমির বর্গা বাবদ ৭৫ হাজার টাকা, পলিথিন ও পানির খরচ ৩০ হাজার টাকা সহ মোট খরচ হয় এক লাখ ৮৫ হাজার টাকা।’ তিনি বলেন, অথচ একর প্রতি উৎপাদিত ৬৭৫ মণ লবণ বিক্রি (প্রতি মণে ১৫০ টাকা) করে পাওয়া যাবে এক লাখ ১৪ হাজার টাকা। চাষীরা এভাবে ক্ষতির মুখে পড়ে চাষ ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে- বলেন, চাষী আমান।

বাংলাদেশ লবণ চাষী বাঁচাও পরিষদের আহবায়ক সাজেদুল করিম কালের কণ্ঠকে জানান- আমি আমার পারিবারিক ১০০ একর জমিতে লবণ উৎপাদন করে আসছি বছরের পর বছর ধরে। গেল বছরের মৌসুমে একর প্রতি এক হাজার মণ লবণও উৎপাদন হয়েছিল। কিন্তু এবার সেই উৎপাদন নেমে গেছে অনেক নিচে। লবণের দাম অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলেও মজুরের দামসহ অন্যান্য কোনো কিছুরই দাম কমেনি।

লবণ ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, সিন্ডিকেট করে বন্ডেড ওয়্যার হাউজের আওতায় ব্যাক টু ব্যাক এলসি এবং ট্যাক্স ফাঁকির মাধ্যমে ক্যামিকেল আইটেমের আড়ালে সোডিয়াম সালফেটের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড (খাবার লবণ) আমদানি করা হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় লবণের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়ে বাজার সয়লাব হয়ে গেছে। ফলে দেশীয় লবণ চাষীরা ন্যায্য মূল্য বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে বিভিন্ন পন্থায় অবৈধভাবে লবণ আমদানি করায় সরকারও হারাচ্ছে রাজস্ব। লবণের মাঠ পর্যায়ে চাষীরা তাদের ন্যায্য মূল্য না পেয়ে এখন ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন।

মহেশখালী-কুতুবদিয়ার সংসদ সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক গতকাল সোমবার কালের কণ্ঠকে জানান, তিনি লবণ মাঠ পর্যায়ের চাষী ও ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের নিয়ে সম্প্রতি শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে কক্সবাজারের লবণ চাষীদের আহাজারির কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সোডিয়াম সালফেটের নামে সোডিয়াম ক্লোরাইড আমদানি বন্ধ করা না গেলে দেশীয় শিল্পটির ওপর মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসবে।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা জানিয়েছেন, গত বৃহস্পতিবার স্থানীয় এমপি আশেক উল্লাহ রফিকসহ একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে লবণের বাস্তব চিত্রটি তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয়টি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সময়ই লবণের দাম মণপ্রতি ছিল ১৮০ টাকা কিন্তু এখন দাঁড়িয়েছে ১৫০ টাকা।

এ প্রসঙ্গে বিসিক কক্সবাজারের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) মো. হাফিজুর রহমান বলেন, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২ লাখ ৩৩ হাজার মেট্রিক টন অপরিশোধিত লবণ মাত্র উৎপাদিত হয়েছে। অথচ গেল বছর এ সময়ে উৎপাদন হয়েছিল ৩ লাখ ৮২ হাজার মেট্রিক টন লবণ। গেল বছর ৬০ হাজার একর জমিতে লবণের চাষ হয়েছিল কিন্তু এবার চাষের জমি অনেক পরিমাণে কমে যাবে।

তিনি জানান, আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে মাঠ জরিপ শুরু করা হবে।

প্রসঙ্গত, কক্সবাজারের লবণ শিল্প উন্নয়ন প্রকল্প কার্যালয়ের সূত্র মতে, ২০১৯-২০ মৌসুমে লবণের চাহিদা ধরা হয়েছে ১৮ লাখ ৪৯ হাজার মেট্রিক টন। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৮ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন।