মেঘা গ্রামের জ্ঞান ও প্রজ্ঞার প্রান-পুরুষ মরহুম মেন্দি মিয়া বেপারী

আরফি হোসেন: চাটখিল উপজেলার বদলকোট ইউনিয়ন ০২নং ওয়ার্ড মেঘা। এই গ্রামের একটি বাড়ীর নাম (সাবেক) মিন্দি মিয়া ব্যাপারী বর্তমান গাজী বাড়ী। এখনকার প্রজন্ম গাজী বাড়ীর মেন্দি মিয়া বেপারী ( মেতি বেরী) সম্পর্কে তেমন জানার কথা নয়। বুদ্ধি, পরামর্শ, বিপদ-আপদ, জন্ম-মৃত্যু, বিবাহ-শাদী, শালিস-দরবারে গ্রামের সবাই প্রথমেই এই জ্ঞানী লোকটির কাছে যেতো। যে কোন বিষয়ে তিনি দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে পারতেন। দরবারে এবং দৈনন্দিন আলাপচারিতায় গল্পের কাহিনী দিয়ে তিনি আনন্দঘন পরিবেশ তৈরী করে সবাইকে মুগ্ধ করে রাখতেন। পেশাগত জীবনে তিনি ধানের ব্যবসা করতেন।পাশাপাশি কৃষি কাজও ছিলো। আজ থেকে ৬০/৭০ বছর আগে মেঘা গ্রামে চরম খাদ্য ঘাটতি এলাকা ছিলো। তখন ইরি ধানের আবাদ বা সেচ-সার ভিত্তিক আবাদ প্রচলিত হয় নাই। আউশ আর আমন বা পৌষ ধানের চাষ হতো। প্রায় প্রতি বছর পৌষ ধান গাছ আসাঢ়-শ্রাবন মাসে ১০/১২ হাত পানির নীচে তলিয়ে বিনষ্ট হয়ে ফসল হতো না। তখন অধিকাংশ পরিবারে মানুষকে খেয়ে না খেয়ে থাকতে হতো। খাদ্যের চাহিদা পূরনে মরহুম মেন্দি মিয়া বেপারী এগিয়ে আসলেন। লাকসাম, বিপুলাশহর, হোমনাবাদ, নাংগলকোট, মেহের, হাজীগঞ্জ, সোনাপুর, রায়পুরের ময়াল থেকে বিশাল লম্বা সরংগা নৌকা ভর্তি করে নানান রং এর বিভিন্ন রকমারি নামের ধান মেঘা গ্রামে নিয়ে আসতেন। তিনি ছিলেন চলমান সংবাদপত্র। বিদেশ থেকে শুধু ধান আনতেন না, একই সাথে ঐ সব অঞ্চলে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর বিবরনও নিয়ে এসে আমাদেরকে শুনাতেন। মেন্দি মিয়া বেপারীর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন ছিল না। তিনি এমন জ্ঞান-বুদ্ধি এবং সৌজন্যবোধের অধিকারী ছিলেন যে, কেউ তাকে অশিক্ষিত বলতে পারতো না। তার আশ্চর্যজনক স্মরন শক্তি ছিলো। ৫০ বছর আগে কোন শালিসে কি রায় দিয়েছেন, মেঘার কার কতটুকু জমি, কার পুকুর পাড়ে আম গাছটি কার ভাগে পড়ছে তিনি মাপজোখ ছাড়াই বলে দিতে পারতেন। এরকম স্মরন শক্তি-সম্পন্ন লোক আমি দ্বিতীয়জন আর দেখি নাই। মেঘা গ্রামের পুরানো শালিস-দরবারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন —- মরহুম বশু পাটোয়ারী, কালাগাজী পাটোয়ারী, সোনামিয়া পাটোয়ারী, নাবালক পাটোয়ারী, মনা মেম্বার, মনা ডিলার, শামসুদ্দিন মেম্বার, মরহুম লোকমান মাস্টার প্রমূখ। এদের মধ্যে সবছেয়ে মেধাবী এবং সর্বজন গ্রহনযোগ্য ছিলেন মরহুম মেন্দি মিয়া বেপারী। আজ মেঘা গ্রামে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাজিস্ট্রেট, প্রিন্সিপাল, প্রফেসার, হেডমাস্টার, উকিল, দেশে-বিদেশে অনেক চাকুরীজীবি, ছোটবড় ব্যবসায়ী সব আছে, নেই শুধু আমাদের সেই বিজ্ঞজন, গ্রামের সবার মাথার উপরের ছাতা শ্রদ্ধেয় মরহুম মেন্দি মিয়া বেপারী। আমি তার রূহের মাগফিরাত কামনা করছি। মন্তব্য করেনঃ জাফর আহম্মদ (সাবেক সচিব)