করোনায় বিপদে এশিয়া

চীন থেকে নতুন করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে অন্যান্য দেশে। বিশেষ করে চীনের প্রতিবেশী দেশগুলোয় এই করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেশি। কোভিড-১৯ নামের এই নতুন রোগে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ এখন বিপদে পড়েছে। একদিকে ভয় দেখাচ্ছে করোনাভাইরাস, অন্যদিকে চোখ রাঙাচ্ছে অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা।

কোভিড-১৯ রোগে মৃত ব্যক্তির সংখ্যা শুধু চীনেই ১ হাজার ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত দেশটিতে নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৬৮ হাজার পার হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সার্স ও মার্সভাইরাসও ছিল একধরনের করোনাভাইরাস। কিন্তু সেই দুটির তুলনায় নতুন করোনাভাইরাসে সংক্রমণের হার বেশি এবং এটি ছড়াচ্ছেও দ্রুত। যদিও এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নতুন এই রোগে মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম; কিন্তু দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় কোভিড-১৯ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ব্যাপক। এরই মধ্যে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে এশিয়ার বাইরে ইউরোপে প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।

চীন অবশ্য বলছে যে তাদের নেওয়া প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার কারণে দেশটিতে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের হার কমে আসছে। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, নতুন করোনাভাইরাসটির কারণে এখনো চীন ঝুঁকির মুখে রয়েছে। এ কারণে চীন জরুরি পরিস্থিতি থেকে বের হতে পারছে না। সংস্থাটি এ-ও বলছে, কোন কোন অঞ্চলে কোভিড-১৯ ছড়িয়েছে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হচ্ছে না।

এমন অনিশ্চয়তার কারণেই চীনের আশপাশের প্রতিবেশী দেশগুলো বিপদে পড়েছে। সিঙ্গাপুর, জাপান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইনস, ইন্দোনেশিয়া, লাওস, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশ ঝুঁকিতে পড়েছে। নতুন রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার পাশাপাশি আছে অর্থনৈতিক ক্ষতিতে পড়ার ভাবনাও।

পরিস্থিতি কী?
সিঙ্গাপুরে গত ২৩ জানুয়ারি কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত প্রথম রোগী চিহ্নিত হয়। এরপর আরও ৪৯ জন ব্যক্তি এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্ত হওয়া প্রথম ১৪ জন এসেছিলেন চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর থেকে। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অংশীদারদের একটি হলো সিঙ্গাপুর। তাই সেখানে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ হওয়া বেশ স্বাভাবিক। তবে শুধু সিঙ্গাপুরের মতো বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোই যে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, তা নয়।

জাপানে ২৮ ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে। থাইল্যান্ডে সংক্রমিত হয়েছেন ৩০ জনের বেশি। হংকংয়ে সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩-তে। মালয়েশিয়ায় তা ১৮। সব ক্ষেত্রেই নতুন করোনাভাইরাস স্থানীয়ভাবে ছড়িয়ে পড়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, উহান থেকে আসা ভাইরাসটি এখন স্থানীয় ব্যক্তিদের মধ্যে সংক্রমিত হচ্ছে। ভিয়েতনামে ১৬ ব্যক্তি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সে দেশে ১০ হাজার মানুষকে কোয়ারেন্টাইনে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফিলিপাইনসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে একজনের মৃত্যুও হয়েছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, লাওস ও মিয়ানমার—এ দুটি দেশেও করোনাভাইরাসে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। কারণ, চীনের সঙ্গে এ দুটি দেশের বিশাল সীমান্ত এলাকা রয়েছে। সেখানে কিছু সন্দেহজনক রোগী পাওয়াও গেছে। তবে এখন পর্যন্ত এ দুটি দেশের সরকার করোনাভাইরাসে কারও আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেনি।

ইন্দোনেশিয়া অবশ্য বলছে, সেখানে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি পাওয়া যায়নি। কিন্তু যে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ চীনা পর্যটক যান, সেখানে এমন দাবি হালে খুব একটা পানি পাচ্ছে না। জানা গেছে, উহান শহর থেকে ফিরিয়ে আনা ইন্দোনেশিয়ার ২৩৮ জন নাগরিককে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হলেও তাদের প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়নি। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, উহান থেকে আসা নাগরিকদের স্বাস্থ্য ভালো আছে মনে হওয়ায় এবং কোভিড-১৯-এর পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ব্যয়বহুল হওয়ায় অতিরিক্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এমন অপ্রতুল প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা থাকায় ইন্দোনেশিয়ায় কোভিড-১৯ আরও ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে এশিয়ার ওই অঞ্চল বিপদাপন্ন হতে পারে।

এদিকে ভারতে শুধু কেরালা রাজ্যে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি চিহ্নিত হয়েছে। স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেরালার চিকিৎসাব্যবস্থা পুরো দেশের মধ্যে সবচেয়ে উন্নত, তাই সেখানে কোভিড-১৯ চিহ্নিত করা গেছে। অন্যান্য রাজ্যে চিকিৎসাসংক্রান্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষা ততটা উন্নত না হওয়ায় রোগটি চোখের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। তবে ধারণা করা হচ্ছে, চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক সিঙ্গাপুর বা থাইল্যান্ডের মতো ঘনিষ্ঠ না হওয়ায় ভারতে এই রোগ ততটা ছড়াতে পারবে না।

সমস্যা কী কী?
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে নতুন করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কঠোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সিঙ্গাপুর। সার্স সংক্রমণের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে এবার জোরেশোরে পদক্ষেপ নিয়েছে দেশটি। গত ১৪ দিনে যেসব ব্যক্তি চীনে ছিলেন, তাঁদের সিঙ্গাপুরে ঢোকার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। হাসপাতাল বা বিভিন্ন অফিসে ঢোকার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে সবার শরীরের তাপমাত্রা মেপে দেখা হচ্ছে। বিমান ও সমুদ্রবন্দর এলাকায় নেওয়া হয়েছে পৃথক সতর্কতামূলক ব্যবস্থা। এমনকি করোনাভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে যাতে গুজব না ছড়াতে পারে, তার জন্য নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।

জাপানও নিয়েছে একই রকম পদক্ষেপ। কিন্তু আর্থিকভাবে ধনী দেশগুলো যেভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে পারছে, সেভাবে পারছে না থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো। এর সঙ্গে অর্থনৈতিক বিষয়ও যুক্ত হয়ে পড়েছে। এশিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক শক্তি অগ্রাহ্য করার মতো নয়। অনেক দেশের সমৃদ্ধিই চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। যেমন: থাইল্যান্ডের মোট জিডিপির এক-দশমাংশ আসে পর্যটন থেকে। আর এই পর্যটকদের একটি বিরাট অংশ আসে চীন থেকে। একই অবস্থা ইন্দোনেশিয়ায়। তাই চাইলেও দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটার টানের আশঙ্কায় কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে না দেশগুলো।

ওদিকে চীনও চোখ রাঙাচ্ছে। বেশ কয়েকটি দেশের বিরুদ্ধে ভ্রমণনিষেধাজ্ঞা দেওয়ার অভিযোগ তুলে চীন বলছে, এর পরিণাম ভালো হবে না! এর বাজে প্রভাব কূটনৈতিক সম্পর্কে পড়বে বলেও হুঁশিয়ার করে দিচ্ছে সি চিন পিংয়ের সরকার। সব মিলিয়ে এশিয়ার দেশগুলো পড়েছে শাঁখের করাতে।

ঝুঁকি কতটা?
নতুন করোনাভাইরাসের কোনো প্রতিষেধক এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। বলা হচ্ছে, এ জন্য লেগে যেতে পারে আরও ১৮ মাস। আক্রান্তের হাঁচি-কাশির সঙ্গে এই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং তা থেকে অনেক মানুষ আক্রান্ত হতে পারে। কিন্তু রোগটি সম্পর্কে বিশদভাবে জানা সম্ভব হয়নি। গবেষণা এখনো চলছে। আর এ কারণেই কোভিড-১৯ নিয়ে আতঙ্ক কমছে না।

এখন পর্যন্ত কিছু নির্দিষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, কিছু ক্ষেত্রে আক্রান্তের মধ্যে উপসর্গ দেখা না-ও যেতে পারে এবং উপসর্গ দৃশ্যমান না থাকলেও আক্রান্তের কাছ থেকে এই রোগ ছড়াতে পারে। জাপানের তোহোকু ইউনিভার্সিটির রোগতত্ত্ববিষয়ক বিশেষজ্ঞ ওশিতানি হিতোশি বলছেন, এ কারণে কোভিড-১৯ চিহ্নিত করার বিষয়টি অনেকটা ‘অন্ধকারে হাঁটা’র মতো হয়ে যাচ্ছে। সামনে কী আছে, তা কেউই নিশ্চিতভাবে ঠাওর করতে পারছে না।

আর এ কারণেই এশিয়ার স্বল্পোন্নত দেশগুলো সবচেয়ে বড় বিপদে পড়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা অপ্রতুল থাকায় অনেক দেশেই সংক্রমণ চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষক মার্ক লিপসিচ বলছেন, চীনের সঙ্গে যেসব দেশের বাণিজ্য ও পর্যটনসংক্রান্ত সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ, সেসব দেশে নতুন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত কাউকে না পাওয়া উদ্বেগজনক। কারণ এতে বোঝা যাচ্ছে, সেসব দেশে করোনাভাইরাস চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে নেওয়া পদক্ষেপে ঘাটতি রয়েছে। এর ফলে হুট করেই করোনাভাইরাস মহামারি আকারে দেখা দিতে পারে। তখন তা সামলানো আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট, বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স, সিএনএন ও আল–জাজিরা