অবৈধ পথে ইতালি যাত্রা: তিউনিসিয়ায় রেড ক্রিসেন্টের আশ্রয়শিবিরে চাটখিলের রুবেল

অবৈধ পথে ইতালীর পথে চাটখিলের শতাধীক তরুন। সঠিক কাজ আর অধিক অর্থ উপর্জানের জন্য নিজের জীবন বাজি রেখে ইউরোপের এসকল দেশে বিভিন্ন মাধ্যমে দালালের মাধ্যমে পাড়ি জমান তারা। চাটখিল নোয়াখালী জেলার একটি ছোট উপজেলা হলেও দেশের বৈদাশিক মুদ্রা অর্জনে চাটখিলের বাসিন্দা প্রবাসীদের তুলানা নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশ স্বাধীন করতে যেমন যুদ্ধে গিয়েছে সাধারণ মানুষ তেমনী চাটখিলে সন্তানেরা অর্থনীতিক যুদ্ধে পাড়ি জমিয়েছে ”দেশের বাহিরে- কেমন আছেন দেশের বাহিরে চাটখিলের ছেলেরা” এই শিরনামে চাটখিলবার্তায় আজকের বিষয় অবৈধ পথে ইতালী যাত্রা! আমাদের সাথে কথা হয়েছে রুবেল নামে একজনের

“আমি শুনতে পাচ্ছিলাম এক বন্ধু বলছে, আর বাঁচা সম্ভব না। তারপর সে জোরে জোরে দোয়া–দরূদ পড়তে থাকে, এরপর আর তার গলা শুনতে পাইনি…।”
এভাবেই তিউনিসিয়া থেকে টেলিফোনে বেনারের কাছে ভূমধ্যসাগরে গত সপ্তায় নৌকাডুবির ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন ওই মৃত্যুযাত্রা থেকে বেঁচে ফেরা মাহমুদুল হাসান রুবেল (২৭)।
নোয়াখালীর চাটখিলের এই বাসিন্দা এখন রয়েছেন তিউনিসিয়ায় রেড ক্রিসেন্টের আশ্রয়শিবিরে। বাংলাদেশ দূতাবাসের একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে বেনারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন রুবেল।

“আমরা ১১ বন্ধু যাত্রা করেছিলাম। বেঁচে আছি মাত্র চারজন,” জানান রুবেল।

অবৈধভাবে লিবিয়া থেকে ইতালি যাওয়ার উদ্দেশ্যে অভিবাসী নিয়ে রওনা দেওয়া একটি নৌকা গত শুক্রবার তিউনিসিয়া উপকূলে ডুবে যায়। যাত্রীদের মধ্যে মধ্যে ১৬ জনকে স্থানীয় জেলেরা জীবিত উদ্ধার করেন, যাদের ১৪ জনই বাংলাদেশি। তাঁরা এখন তিউনিসিয়ার রেড ক্রিসেন্টের আশ্রয় শিবিরে আছেন।

“লিবিয়া থেকে রওনা হওয়ার পর ভেবেছিলাম, স্বপ্নের খুব কাছাকাছি আমরা। কয়েক মাস বন্দী থাকার পরে মনে হচ্ছিল আর মাত্র একটা দিন পরেই পৌঁছে যাব স্বপ্নের দেশ ইতালিতে। সেই স্বপ্ন ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়,” বলছিলেন রুবেল।

এদিকে রুবেলের বোন বুবলি আক্তার বুধবার নোয়াখালী থেকে টেলিফোনে বেনারকে জানান, এসএসসি পর্যন্ত পড়াশোনা করা রুবেলের দেশে চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই। তাই অনেক কষ্টে সাত লাখ টাকা দিয়ে গত ডিসেম্বরে রুবেলকে তাঁরা ইতালি পাঠান।

পরবর্তীতে লিবিয়ায় রুবেলকে আটকে রেখে দালালেরা পরিবারের কাছ থেকে আরো দুই লাখ টাকা আদায় করে বলে জানান বুবলি।

রুবেল জানান, লিবিয়া থেকে ১৫০ জন যাত্রী নিয়ে দুটি ট্রলার ইতালির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছিল। নৌকা দুটির যাত্রীদের মধ্যে ১৩৫জনই ছিলেন বাংলাদেশি।

“আনুমানিক মিনিট দশেক চলার পরেই আমাদের ট্রলারটি ডুবে যেতে থাকে। আমরা ৮–৯ জন ট্রলার ধরে ঢেউয়ের সাথে সাঁতার কেটেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা,” বলেন রুবেল।

এভাবে আনুমানিক ৮-৯ ঘণ্টা ভূমধ্যসাগরে ভেসে থাকার পর স্থানীয় একটি মাছের ট্রলার তাঁদেরকে উদ্ধার করে জানিয়ে রুবেল বলেন, “বিশ্বাস হচ্ছে না আমি বেঁচে আছি।”

রুবেলের ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের পরিণতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, “আমার আরেক বন্ধু কামরানের বাড়ি টঙ্গিতে। সে সাঁতার জানত না। মারা যাওয়ার আগে সে বারবার বলছিল, তাকে কেউ যেন উদ্ধারের চেষ্টা না করে, কারণ সে সাঁতার জানে না।”

“আমার আরেক বন্ধু সাঈদের বাড়ি মাদারিপুরে। আমি প্রায় এক ঘণ্টা তাঁর হাত ধরে রেখেছিলাম। কিন্তু সেও ঢেউয়ের সাথে ভেসে গেছে,” বলেন রুবেল।

এই যাত্রায় নোয়াখালী থেকে রুবেলের সাথে নাসির নামের আরেক যুবক রওয়ানা দিয়েছিলেন।

“নাসিরও বেঁচে নেই,” সংক্ষেপে জানান রুবেল।

অবৈধ অভিবাসন প্রত্যাশীদের পরিবার সদস্যদের বর্ণনার ওপর ভিত্তি করে তৈরি চিত্ররেখা। [বেনারনিউজ]
‘দেশে না ফিরুক রুবেল’ : রুবেলের জীবনে অত ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটার পরও পরিবার চায় না রুবেল দেশে ফিরে আসুক।

নৌকা ডুবির ঘটনায় উদ্ধার বাংলাদেশিদের দেশে ফেরত আনা হতে পারে শুনে রুবেলের বোন বুবলি পাল্টা প্রশ্ন করেন, “দেশে কেন আনা হবে? ওখানে কোনো কাজের ব্যবস্থা করা যায় না?”

নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বুবলি দেশের বিভিন্ন অনিশ্চয়তার প্রসঙ্গ টেনে বেনারকে জানান, রুবেলকে বিদেশ পাঠাতে গিয়ে তাঁদের পরিবার প্রায় নিঃস্ব হয়ে গেছে।

বুবলি জানান, বাবা নেই তাঁদের। পাঁচ ভাই–বোনের মধ্যে রুবেল একমাত্র ভাই। দুই বোনের বিয়ে হলেও বাকি দুই বোন এবং মায়ের একমাত্র অবলম্বন রুবেল।

“দেশে কর্মসংস্থান প্রায় নেই বললেই চলে,” মন্তব্য করে ওয়ারবি ডেভলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুল হক বেনারকে বলেন, “এই ঘটনায় যারা গেছে তাদের মধ্যে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের শিক্ষিত যুবকেরাও আছে। তারা একেবারে অসচেতন নয়। তবু তারা একটা ঝুঁকি নিয়েছে। কারণ দেশেও একটা চাকরি নিতে হলে টাকা ছাড়া হয় না। তারা ভেবেছে দেশে যখন হয় না বিদেশেই চান্স নিয়ে দেখি।”

তাই এমন ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন চেষ্টার মূল কারণ খোঁজার পরামর্শ দেন সাইফুল।